কটিয়াদীতে তিন খাল পুনর্খননে কৃষিতে আশার আলো, ফিরেছে মাছ ও জীববৈচিত্র্য
খাল পুনর্খননের ফলে শুধু মাছের প্রাচুর্যই ফিরছে না, কৃষকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন আশাবাদ। বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পাশাপাশি সেচ সুবিধা বাড়ায় বছরে একাধিক ফসল ফলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ফিরতে শুরু করেছে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রাণচাঞ্চল্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খালের দুই পাড়ে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহু বছর আগে খালটি আড়িয়াল খাঁ নদের একটি শাখা ছিল। পরে পলি ও মাটি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এটি ‘মরা নদী’ হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয়দের দাবি, ১৯৭৮ সালের দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে জালালপুরে এসে খাল কাটার কর্মসূচির উদ্বোধন করেন এবং নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কাজের সূচনা করেন। এরপর থেকেই লোকমুখে খালটির নাম হয় ‘কাটা খাল’।
প্রায় দুই দশক ধরে মাটি, পলি ও ময়লা-আবর্জনা জমে খালটির পানিপ্রবাহ অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে খালটি। সম্প্রতি পুনর্খননের পর আবারও পানিপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এর সুফল পেতে শুরু করেছেন কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, খালের আশপাশে প্রায় ৬১৮ একর কৃষিজমি রয়েছে। পুনর্খননের ফলে লোহাজুরী পূর্বচর, অরিয়াধর, দশপাখি ও জালালপুর এলাকার বৃষ্টির পানি সহজে নদীতে নামতে পারবে। পাশাপাশি খালে পানি সংরক্ষণ ও সেচের ব্যবস্থা থাকলে কৃষকরা বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন।
কটিয়াদী উপজেলায় আরও দুটি খাল পুনর্খনন করা হয়েছে। এগুলো হলো—লোহাজুরী ইউনিয়নের ঝিরারপাড়-বাহেরচর খাল এবং বনগ্রাম ইউনিয়নের কুরহানি বিলের খাল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জালালপুরের কাটা খালে পানিপ্রবাহ বেড়েছে। খাল থেকে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি তুলে দূরের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। আগে বর্ষার পানি দীর্ঘদিন জমে থাকায় যেসব জমিতে ফসল উৎপাদন সম্ভব হতো না, সেসব জমি থেকে পানি খালে নেমে যাওয়ায় আবারও চাষাবাদ শুরু হয়েছে। খালের দুই পাশের জমিতে ধানের চারা রোপণের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন কৃষকরা। শুকনো মৌসুমে বাদাম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষের আগ্রহও তৈরি হয়েছে। এতে অনেক পতিত জমি চাষের আওতায় আসছে।
বনগ্রাম ইউনিয়নের কুরহানি বিল থেকে সিংগুয়া নদী পর্যন্ত পুনর্খনন করা খালেও বৃষ্টির সময় পানিপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে। এ সময় স্থানীয়রা ধর্মজাল দিয়ে ছোট মাছ শিকার করছেন। স্থানীয়দের দাবি, পুনর্খননের ফলে প্রায় ৪০ বছর পর ওই এলাকায় আবার পানির প্রবাহ দেখা গেছে। এতে কৃষকদের মধ্যেও আনন্দ ফিরে এসেছে।
তবে লোহাজুরী ইউনিয়নের ঝিরারপাড়-বাহেরচর খালটি পুনর্খনন করা হলেও এখনো পুরোপুরি পানিপ্রবাহ তৈরি হয়নি। একটি স্থানে পুকুর থাকায় খালের দুই পাশের সংযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে খালে পানি জমে থাকলেও কৃষকরা এখনো কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না।
জালালপুর এলাকার কৃষক আলকাস মিয়া বলেন, ‘একসময় বোরো ধান ছাড়া অন্য মৌসুমি ফসল উৎপাদন করতে পারতাম না। বর্ষায় অনেক জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকত। এখন খালে পানি নেমে গেছে। ধানের চারা রোপণ করছি।’
ষাটোর্ধ্ব কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘খালের পরিষ্কার পানিতে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে। আমার জমিতে অগ্রহায়ণী ধান রোপণ করছি। খালে পানি থাকলে বছরে তিনটি ফসল করতে পারব। আমার মতো শত শত কৃষকের জন্য এটা ভালো হয়েছে।’
মাছ শিকারি হাশিম বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর আগে জাল দিয়ে মাছ ধরতাম। এতদিন তা বন্ধ ছিল। এখন আবার খালে পানি এসেছে। তাই জাল নিয়ে মাছ ধরতে নামছি।’
কৃষক সাইদুর রহমান মানিক বলেন, ‘আগে খালটি খনন করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এলাকার মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন। এখন পুনর্খননের ফলে আবারও কৃষক ও এলাকাবাসী উপকৃত হচ্ছেন।’
বনগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ‘কুরহানি বিল থেকে সিংগুয়া নদী পর্যন্ত খাল পুনর্খননের ফলে এলাকার হাজারো কৃষক উপকৃত হচ্ছেন। বৃষ্টি হলেই শত শত মানুষ মাছ শিকার করতে নামছেন। জীববৈচিত্র্য প্রাণ ফিরে পেয়েছে, মৃত খাল যেন আবার জেগে উঠেছে।’
কটিয়াদী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বনগ্রাম ইউনিয়নের কুরহানি বিল থেকে সিংগুয়া নদী পর্যন্ত খাল পুনর্খননের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৫৫০ মিটার। আর জালালপুর ইউনিয়নের কাটা খাল থেকে অরিয়াধর পর্যন্ত পুনর্খনন করা হয়েছে ১ হাজার ৫০ মিটার। দুটি খাল প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ১ কোটি ২৮ লাখ ৮২ হাজার ৮৩৮ টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১ টাকা। অব্যয়িত ১৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। দুটি খালের গড় অগ্রগতি ৯০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
কটিয়াদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, জালালপুর, বনগ্রাম ও লোহাজুরী ইউনিয়নে তিনটি খাল পুনর্খননের ফলে কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শুকনো মৌসুমে খালের পানি ব্যবহার করে রবিশস্য উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকরা লাভবান হতে পারবেন। পাশাপাশি বছরে তিনটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও খালগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, খালের দুই পাশে পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতে তা সহায়ক হবে। তবে ফসল উৎপাদনে যাতে সমস্যা না হয়, সেজন্য নিয়মিত ডালপালা ছাঁটাই করা যেতে পারে।
খাল পুনর্খননের ফলে কটিয়াদীর এসব এলাকায় একদিকে যেমন পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে, অন্যদিকে মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্যও ফিরে আসছে। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের আশা, খালগুলোর পানিপ্রবাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ অব্যাহত থাকলে কৃষি, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর সুফল আরও বিস্তৃত হবে।

Post a Comment